বাঙলা বানানে ভাইরাস-৩ ।। আবদুল হাকিম।।

 বাঙলা বানানে ভাইরাস-৩ ।।

আবদুল হাকিম

প্রথম লেখা – ২০০৩
সঙস্করন – ২০২১।।



অধ্যাপক সিরাজুল ইসলাম চৌধুরী তার ওই পত্রিকাটিতে লিখেছেন, ” কিনতু আমি না মানলে কি হবে, পত্রিকার সম্পাদক, কম্পিউটারকর্মী সকলেই মেনে নিয়েছেন । বাঙালী বানান যতবার বাঙালী লিখি ততবারই দেখি সংশোধিত হয়ে গেছি । ” তার এই কথায় প্রমান হয় যে সময়ের সাথে সাথে ভাষাও সামনে এগিয়ে চলে । তাকে ঠেকিয়ে রাখা যায়না । কম্পিউটার কর্মিকে’তো ঈ-কারের পরিবর্তে ই-কার বসিয়ে দিতে কেউ গোপনে শিখিয়ে দেয়নি । এবঙ ওই কম্পিউটার কর্মি’র এই কাজের ফলে ” বাঙালী ” শব্দটি কিন্তু অজান্তেই ” বাঙালি ” রুপ ধারন করেছে । এজন্য কিনতু আমরা কেউ রাজপথে আন্দলনে নেমে পড়িনি । পক্ষান্তরে আমরা ওই বানানটিকে মেনে নিয়েছি । সব কম্পিউটার কর্মি’কে ব্যাকরন বিশারদ বানানো কি সম্ভব ? ভাষা বা বানান সময়ের সাথে সাথে তার নিজ গতিতেই এগিয়ে চলে । চলবে । তাই এই ” বাঙালি ” বানানটি ধরে রাখতে পারলে আমাদের জাতির বানান নিয়ে সব বিভ্রান্তি আর বিতর্কের অবসান হবে বলেই মনে হয় ।

বাঙলা বা বাঙালি শব্দ দু’টি আমরা উচ্চারন করতে গিয়ে খুব কম ক্ষেত্রেই বাঙ্গলা বা বাঙ্গালি উচ্চারন করে থাকি । বাঙ্গলা বা বাঙ্গালি বলতে বা লিখতে গিয়ে ঙ এবঙ গ যুক্ত ভাবে এসে যাচ্ছে । বাংলা বা বাংগালি / বাংগালী শব্দগুলোর খেত্রেও একই কথা বলতে হয় । যেখানে বাঙলা বা বাঙালি উচ্চারনে আমরা অভ্যস্ত এবঙ এই বানানটাকে আমরা অনেকেই মেনে নিয়েছি, তবে কেন আর মাঝখানে গ কে নিয়ে টানাটানি । এ খেত্রে আরও দু’টি অক্ষর নিয়ে সমস্যায় পড়তে হচ্ছে । এগুলো হল ং এবঙ ঈ । ং এর বদলে ঙ সব খেত্রেই ব্যবহার করা সম্ভব । এ’দুটি অক্ষরের কাজ একই । আর ঈ’র বদলে ই ব্যবহারেও একই কথা । তাই বাঙলা বা বাঙালি শব্দদুটি লিখতে গিয়ে অযথা ং গ ঈ অক্ষর তিনটি নিয়ে এসে বানান বিভ্রাট সৃষ্টি করার কোন যুক্তি নেই ।

সুনীল গঙ্গোপাধ্যায় তার ” পূর্ব – পশ্চিম ” উপন্যাসে “ বাঙলাদেশ “ লিখতে গিয়ে এক জায়গায় ং, অন্য জায়গায় ঙ ব্যবহার করেছেন । পৃষ্ঠা – ৩৩৪ ও ৪৩০ । বাঙলা একাডেমি থেকে প্রকাশিত অধ্যাপক মনসুর মুসা রচিত দু’টি বই, ” প্রাথমিক বাঙলা সাংগঠনিক পাঠ ” ও ” বাঙলা পরিভাষা ইতিহাস ও সমস্যা ” । এখানে বই দু’টির নাম করনে “ বাঙলা “ লিখতে ঙ ব্যবহার করা হয়েছে । কিনতু “ বাঙলা একাডেমি “ লিখতে গিয়ে ং ব্যবহার করা হয়েছে । লেখকের আর একটি বই, ” ভাষা পরিকল্পনা ও অন্যান্য প্রবন্ধ ” । বইটির চমতকার প্রচ্ছদের একটি লাইন এভাবে লেখা হয়েছে, ” বাঙলাদেশের ভাষা বাঙলা ” । আবার, বদরুদ্দিন উমর রচিত ” সংস্কৃতি সংকট ” বইটির পাতায় আমরা “ বাঙলাদেশ “ কথাটির বানান দু’রকমই দেখতে পাই । যেমন, ” বাংলাদেশ ” ও ” বাঙলাদেশ ” । শহিদ জননি জাহানারা ইমাম তার ” একাত্তরের দিনগুলি ” বইটিতে “ বাঙলাদেশ “ বানান লিখতে গিয়ে সবসময়ই ঙ ব্যবহার করেছেন । তিনি লিখেছেন ” বাঙলাদেশ ” । ডঃ হুমায়ুন আজাদ’ও লিখেছেন “ বাঙলাদেশ “ । উদাহরন – “ আমরা কি এই বাঙলাদেশ চেয়েছিলাম । “ আমাদের দেশের নামের বানান একাধিক । এটা কি খুবই সুখকর ? এখন “ বাঙলা “, “ বাঙালি “ বা “ বাঙলাদেশ “ শব্দ তিনটির বানানের এই বিভিন্নতা নিয়ে যদি কেউ প্রস্ন তোলেন, তাকে কি দোষ দেয়া যাবে ? আপনার সন্তান যদি জিজ্ঞেস করে, মা / বাবা – “ বাঙলা “ বানান কোনটা লিখব ? আপনার ছোট ভাই বা বোন যদি জানতে চায়, দাদা – “ বাঙালি “ বানান কোনটা ঠিক ? অথবা আপনার ছাত্রছাত্রি যদি প্রস্ন করে, স্যার / আপা – “ বাঙলাদেশ “ বানান কি হবে ? আপনাকে’তো চুপ করে থাকলে চলবে না । আপনাকে’তো উত্তর দিতে হবে । আমাদের দেশ এক, জাতি এক, ভাষা এক । অতএব এদের নামের বানান’ও কি অভিন্ন হওয়া বাঞ্ছনিও নয় ? আমাদের ভাষার নামের বানান চার রকম, আর জাতির নামের বানান ছয় রকম । আর দেশের নামের বানান দুই রকম । এটা আমাদের ভাষা, জাতি বা দেশের জন্য কি খুবই সম্মানজনক ?

আমার কাছে মনে হয়েছে, আমাদের ভাষার বানান, জাতির বানান আর দেশের বানান ; এই তিন বানানের ভিতর একটা সামঞ্জস্য থাকা বাঞ্ছনিয় । কিনতু প্রায়ই আমরা এই তিন বানানের ভিতর অসামঞ্জস্য খুজে পাই । যেমন ” বাঙলা ” , ” বাঙ্গালী ” , ” বাংলাদেশ ” । যে শব্দগুলো লেখা হচ্ছে, তা সবগুলোই শুদ্ধ । এখন প্রস্ন হল, এই অসামঞ্জস্য কি আমাদের জন্য, প্রতিটি বাঙলাভাষির জন্য খুবই গৌরবের ? সম্মানের ? শব্দ তিনটি পাসাপাসি রেখে একবার তাকিয়ে দেখতে কি খুবই নান্দনিক মনে হয় ? উত্তর গুনিজনরাই ভাল দিতে পারবেন । আমি সুধু এটুকুই বলতে পারি, যেহেতু ঈ-কার, ং, এবঙ গ ছাড়া ওই শব্দগুলো লেখা যায়, তাই শব্দ তিনটি এভাবে লেখাই কি যুক্তিসঙ্গত নয় ? – ” বাঙলা ” , ” বাঙালি ” , ” বাঙলাদেশ ” ।

বানানের এই বিভ্রাট পুষে না রেখে এর সহজ কোন সমাধান খুজে দেখতে গেলে হয়তো একটা পথ পাওয়া সম্ভব । আর যদি ব্যাকরন বা ধ্বনিতত্বের কঠিন পান্ডিত্যপুর্ন হিসেব নিকেসের নিক্তিতে পরিমাপ করতে যাই, তাহলে আর হলনা । সমস্যা যেখানে ছিল সেখানেই থেকে যাবে । পরিবর্তন, সঙস্কার বা আধুনিকায়ন কোনদিনই প্রচলিত নিয়ম কানুন বা বিধি বিধান মেনে হয় না । সেখেত্রে চাই বিপ্লব । আর বিপ্লব ঘটাতে হলে প্রয়োজন আধুনিকতা ও ইতিবাচক মনোভাব । – ( চলবে- আগামী মঙ্গলবার আবার প্রকাশিত হবে ।। )

আবদুল হাকিম ।।

প্রবাসী লেখক ।। 

মন্তব্যসমূহ