বাঙলা বানানে ভাইরাস-৪ ।। আবদুল হাকিম ।।
আবদুল হাকিম ।।
প্রথম লেখা – ২০০৩।।
সঙস্করন – ২০২১।।
এবার একটু পিছন ফিরে তাকাই । এমন একটা সময় ছিল যখন গদ্য সাহিত্যের কথা কেউ ভাবতেও পারতনা । সাহিত্য বলতে ছিল সুধু পদ্য । কিনতু সময় বসে থাকল না । তার নিজস্ব তাগিদে গদ্যকে ঠিকই টেনে আনল । গদ্য সাহিত্যে সাধু ভাষাতো বটেই, তার উপর কঠিন দাতভাঙা বাঙলা লেখার প্রতিযোগিতা চলতে থাকলো বহুদিন ধরে । অবশেষে এলেন প্যারিচাঁদ মিত্র (টেকচাঁদ ঠাকুর) তার ” আলালের ঘরের দুলাল ” নিয়ে । প্রথমবারের মত তিনি ব্যবহার করলেন কথ্য ভাষা তার উপন্যাসে । ব্যাস । আর যায় কোথায় । হায় হায় । গেল গেল । সাধারন মানুষের মুখের ভাষায় সাহিত্য রচনা ! কথ্য ভাষায় উপন্যাস ! কি সর্বনাস ! সাহিত্যের মান একেবারেই ধুলোয় মিসিয়ে দিল ব্যাটা । ব্যাটাকে ধর । একঘরে কর । কিছুদিন চললো বাক-বিতন্ডা । কাদা ছোড়াছুড়ি । সময়ের সাথে সাথে যাদের বোঝার তারা ঠিকই বুঝলেন । আর গোঁড়াপন্থিরা আকড়ে ধরে রাখলেন তাদের গোঁড়ামিকে । স্বয়ঙ রবীন্দ্রনাথও বুঝেছিলেন ব্যাপারটা । তাইতো তার সাহিত্য সমুদ্রে সাধু ও চলিত দু’রকম ভাষার প্রয়োগই দেখা যায় । প্রথম দিককার লেখায় সাধু এবঙ পরে এসে চলিত । তিনি নিঃসন্দেহে দারুন বুদ্ধিমান ছিলেন, তাইতো সময়ের দাবিকে অগ্রাহ্য করেননি । পাসাপাসি সে সময়ের অনেক বাঘাবাঘা কবি সাহিত্যিক আর পন্ডিতরা প্যারিচাঁদ মিত্রের মত’তো গ্রহন করেনইনি, বরঙ তাকে চ্যালেঞ্জ ছুড়ে দিয়েছিলেন । কিনতু ইতিহাস তাদের পক্ষে কথা বলেনা । প্যারিচাঁদ মিত্রকেই ইতিহাস লুফে নিয়েছিল । মহাকবি মাইকেল মধুসুদন দত্তকেও একই সমস্যার সম্মুখিন হতে হয়েছিল । তাঁর নাটক বা অমিত্রাক্ষর ছন্দ দেখে তৎকালিন গোঁড়াপন্থিরা বিলেতি স্টাইলের ধুয়ো তুলে নাক সিটকেছিলেন । তাঁকে ম্লেচ্ছ বলে গালি দিয়েছিলেন । কিনতু ইতিহাস বলে, মাইকেলের নাটক বা অমিত্রাক্ষর ছন্দ, বাঙলা ভাষা, সাহিত্য বা সঙস্কৃতিতে এক নতুন যুগের সৃষ্টি করেছিল । সুধু তাই নয়, দাড়ি কমা সেমিকোলন, এই যতি চিহ্নগুলোও কিনতু গোড়ার দিকে ছিলনা । সময়ের প্রয়োজনেই এগুলো এসেছে । উদাহরন – ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগর রচিত ” বেতাল পঞ্চ বিংশতি ” । শুনেছি, আরবি ভাষায় একসময় জের জবর পেস ছিল না । সময়ের প্রয়োজনেই এগুলো পরে এসেছে । যুগে যুগে এভাবেই ভাষার আধুনিকায়ন হয়ে থাকে । যুগের দাবি মেনে নেয়াইতো বুদ্ধিমানের কাজ । অবস্য আমাদের দেশের একটি প্রধান পত্রিকা ” দৈনিক ইত্তেফাক ” বহুদিন ধরে তাদের ঐতিহ্য ধরে রাখার চেষ্টা করেও অবশেষে রনে ভঙ্গ দিয়ে সাধু ভাষা থেকে চলিত ভাষায় ফিরে এসেছে । সাধু । সাধু ।
তবে হ্যা, বাঙলা ভাষাকে সমৃদ্ধ করার জন্য সেকালের পন্ডিতরা বহু বিদেশি শব্দ, বিশেষ করে সঙস্কৃত শব্দ বা অক্ষরকে বাঙলা ভাষায় ঢুকিয়েছেন । এবঙ বাঙলা ভাষায় ওই শব্দ বা অক্ষর ব্যবহারের একটা নিতিমালা দিয়ে গেছেন । কিনতু সময় অনেক গড়িয়েছে । এখন আর ওই শব্দ বা অক্ষরগুলো বিদেশি অথবা সঙস্কৃত শব্দ বা অক্ষরের পরিচয়ে বসে নেই । ওগুলো এখন বাঙলার নিজস্ব সম্পদ । তাই এগুলো ব্যবহারে আলাদা কোন নিতিমালার আর প্রয়োজন নেই । এখানে বদরুদ্দিন উমর রচিত ” সংস্কৃতির সংকট ” বইটির ৬৭ পৃষ্ঠা থেকে দু’টি লাইন আমরা দেখতে পারি । তিনি লিখেছেন, – ” প্রায় আড়াই হাজার আরবী ফারসী তুর্কী শব্দ কয়েক শতকের বিবর্তনের মধ্যে দিয়ে বাংলা ভাষায় সহজ ভাবেই প্রচলিত হয়ে এসেছে এবং সেগুলি বাংলার নিজস্ব সম্পদেই পরিণত হয়েছে । ” বাঙলা ভাষা লেখাপড়ার ভাষা হিসেবে সমৃদ্ধ হয়েছে অনেক পরে একথা সত্যি, কিনতু মানুষের মুখের ভাষা হিসেবে এ ভাষা অনেক পুরনো । পক্ষান্তরে সঙস্কৃত ভাষা সুধু পন্ডিতজনের পান্ডিত্য চর্চারই ভাষা । এ ভাষা কোনদিন কোন মানুষের মুখের ভাষা ছিলোওনা, ভবিষ্যতে কোন মানুষের মুখের ভাষা হবেওনা । অনেকে বলে থাকেন, বাঙলা ভাষার উৎপত্তি সঙস্কৃত থেকে । কথাটা বোধ হয় ঠিক না । যে ভাষা কোনদিন কোন মানুষের মুখের ভাষা ছিল না, সে ভাষা থেকে একটা জনগোষ্ঠীর মুখের ভাষার জন্ম হয় কি ভাবে ? মানুষ তো লেখাপড়া শেখার আগেই মুখে কথা বলা শেখে । কথ্যরুপ থেকেই লেখ্য রুপের উৎপত্তি হয়ে থাকে । তবে একথা সত্যি যে পান্ডিত্যপুর্ন ও উচ্চাঙ্গের এই সঙস্কৃত ভাষা থেকে কিছু নেবার কারনে বাঙলা ভাষার সমৃদ্ধি আর সৌন্দর্য অনেক বেড়েছে এ বিষয়ে কোন সন্দেহ নেই । আর তাই সঙস্কৃত একটি অত্যন্ত উচুমানের ভাষা হওয়া সত্বেও বর্তমানে তার প্রয়োজন হারিয়েছে । যে ভাষার নিজেরই কোন অস্তিত্ব নেই, সে ভাষার পরিচয়ে আজও বাঙলা ভাষায় কিছু শব্দ বা অক্ষর চিহ্নিত হবার কোন প্রয়োজন নেই । এতে সুধু জটিলতাই বাড়বে । তৎসম আর তদ্ভব’র যাঁতাকলে পড়ে আধুনিক ছাত্রছাত্রিদের সাথে সাথে আধুনিক শিক্ষকরাও যেমন ঘেমে নেয়ে উঠবেন, তেমনি অফিস আদালতে প্রতিনিয়ত চলতে থাকবে মাতৃভাষার যাচ্ছেতাই ব্যবহার । – ( চলবে- পরের লেখা আগামী শুক্রবার । লেখকের সব লেখা গুলি আমাদের ব্লগে প্রচারিত । )
আবদুল হাকিম ।।
বাল্টিমোর , ইউ এস এ ।।
# হ্যালো জনতা ডট কম #

মন্তব্যসমূহ
একটি মন্তব্য পোস্ট করুন