প্রয়োজনীয়-অপ্রয়োজনীয়’ ১৫ ওকি গাড়িয়াল ভাই- আকরাম উদ্দিন আহমেদ ।।

 প্রয়োজনীয়-অপ্রয়োজনীয়’ ১৫ - 

 
# আকরাম উদ্দিন আহমেদ ।

ওকি গাড়িয়াল ভাই!!


চিলমারী, কুড়িগ্রাম জেলার প্রত্যন্ত এলাকার একটি উপজেলা। এই উপজেলার ঐতিহ্য গরুর গাড়ি। এক সময় চিলমারী ছিল গরুর গাড়ির জন্য বিখ্যাত। এই গরুর গাড়িকে কেন্দ্র করে ভাওয়াইয়া ও পল্লীগীতির সম্রাট মরমি শিল্পী আব্বাস উদ্দিন চিলমারীর ঐহিত্যকে সামনে রেখে সুর মিলালেন-
‘ওকি গাড়িয়াল ভাই,
হাঁকাও গাড়ি তুই চিলমারী বন্দরে।
সে সময় স্বনামধন‍‍্য ও প্রভাবশালী ব্যক্তিগণ পল্লী অঞ্চলে গরুর গাড়িতে করে একস্থান থেকে অন্যস্থানে যাতায়াত করতেন। তখনকার সময় বিয়ে মানেই কে কত বেশি গরুর গাড়ির দীর্ঘ লাইনের বহর নিয়ে আনতে যাবেন বাড়ির বউ।
আর ঐ গরুর গাড়ির সঙ্গে থাকত "হিজ মাস্টার্স ভয়েস" কলের গান চালিত মাইক। ঐ মাইকের সুর ভাসত- ‘
যে দিন গাড়িয়াল উজান যায়,
নারীর মন মোর উইড়া রয় রে।
ওকি গাড়িয়াল ভাই,
হাঁকাও গাড়ি তুই চিলমারীর বন্দরে।
গাড়িয়ালের পরনে থাকতো লুঙ্গি, গায়ে গেঞ্জি। আর মাথায় চিলমারীর গামছা।
আধুনিক যানবাহনের বিস্তার লাভ এবং রাস্তাঘাট উন্নত হওয়ার কারণে গ্রামবাংলার ঐতিহ্য গরুর গাড়ির কদর কমেছে। পল্লীর পথে-প্রান্তরে এখনও কিছু গরুর গাড়ির দেখা মেলে। তবে তার কদর নেই বললেই চলে। বর্তমানে বিয়েতে আর গরুর গাড়ি দেখা যায় না। এখন গরুর গাড়ি রাখা একটি ব‍্যয় সাপেক্ষ ব‍্যপার। গরুর দাম বেশি। কাঠ, বাঁশ ও গো-খাদ্যের দাম বেশি। অপরদিকে যান্ত্রিক যানবাহনে গতি বেড়েছে। গরীব কৃষকদের অভাব-অনটন লেগেই আছে। এসব কারণে গ্রামবাংলার ঐতিহ্য গরুর গাড়ি হারিয়ে যাচ্ছে। আর আজকাল নববধূরা উঠছেন মোটরগাড়িতে।

কালের পরিক্রমায় আধুনিকতার স্পর্শে গ্রামবাংলার ঐতিহ্যবাহী গরুর গাড়ি এখন শুধুই স্মৃতি। গ্রামগঞ্জের আঁকাবাঁকা মেঠো পথে ধীরে ধীরে বয়ে চলা গরুর গাড়ি এখন আর চোখে পড়ে না। যা এক সময় আবহমান বাংলার ঐতিহ্যবাহী বাহন হিসেবে প্রচলিত ছিল এবং যোগাযোগের একমাত্র অবলম্বন ছিল। মাত্র দুই যুগ আগেও পণ্য পরিবহন ছাড়াও গ্রামগঞ্জে বিয়ের বর-কনে বহনে বিকল্প কোনো বাহন কল্পনাই করা যেত না।

রংপুর ও রাজশাহী বিভাগের বিভিন্ন জেলা উপজেলার গ্রামবাংলার জনপ্রিয় গরুর গাড়ি এখন অধিকাংশ অঞ্চল থেকে বিলুপ্তির পথে। এখন এসব বাহন রূপকথার গল্পমাত্র এবং বিলুপ্ত হয়ে স্থান পেয়েছে সংবাদপত্র ও বইয়ের পাতায়। মাঝেমধ্যে প্রত্যন্ত এলাকায় দু-একটি গরুর গাড়ি চোখে পড়লেও শহরাঞ্চলে একেবারেই দেখা যায় না। আধুনিক সভ্যতায় ঐতিহ্যবাহী গরুর গাড়ি হারিয়ে যেতে বসেছে। সে কারণে শহরের ছেলেমেয়েরা দূরের কথা, বর্তমানে গ্রামের ছেলেমেয়েরাও গরুর গাড়ির শব্দটির সঙ্গে পরিচিত নয়। আবার অনেক শহুরে শিশু গরুর গাড়ি দেখলে বাবা-মাকে জিজ্ঞেস করে গরুর গাড়ি সম্পর্কে।

অনুমান করা হয়, খ্রিস্টজন্মের এক হাজার ৬০০ থেকে এক হাজার ৫০০ বছর আগেই সিন্ধু অববাহিকা ও ভারতীয় উপমহাদেশের উত্তর-পশ্চিম অঞ্চলে গরুর গাড়ির প্রচলন ছিল, যা সেখান থেকে ক্রমে ক্রমে দক্ষিণেও ছড়িয়ে পড়ে।

গরু গাড়ি দুই চাকাবিশিষ্ট গরু বা বলদে টানা এক প্রকার বিশেষ যান। এ যানে সাধারণত একটি মাত্র অক্ষের সাথে চাকা দুটি যুক্ত থাকে। গাড়ির সামনের দিকে একটি জোয়ালের সাথে দুটি গরু বা বলদ জুটি মিলে গাড়ি টেনে নিয়ে চলে।
সাধারণত চালক বসেন গাড়ির সামনের দিকে। আর পেছনে বসেন যাত্রীরা। যাত্রী পরিবহনের জন্য বাঁশের চাটাই মুড়ানো ছাউনির ব‍্যবস্থা থাকে। বিভিন্ন মালপত্র বহন করা হয় ছাউনি খুলে গাড়ির পেছন দিকে। যুগ যুগ ধরে কৃষকের বিভিন্ন ধরনের কৃষি ফসল বিপনন ও বহনের গুরুত্বপূর্ণ বাহন হিসেবে পরিচিত ছিল গরুর গাড়ি। গ্রামগঞ্জের হাট গুলোতে গরু গাড়ি বোঝাই পাট আসতো বিক্রয়ের জন্য।
গ্রাম বাংলায় ঐতিহ্যগতভাবে গরুর গাড়ি দুই  দশক আগেও যাতায়াত ও মালবহনের কাজে ব্যবহৃত হতো। একাত্তরের  স্বাধীনতা যুদ্ধের সময় হানাদার পাক সেনাদের হাত হতে জীবন রক্ষা করতে অনেক পরিবারকে এই গরুর গাড়ি করেই দেশের প্রত‍্যন্ত অঞ্চল বা গ্রামেগঞ্জে আশ্রয় নিতে হয়েছে। অনেকের আবার ভারতীয় সীমান্ত পার হয়ে স্বরণার্থী হতে এই বাহনের উপর নির্ভর করতে হয়েছে।

বিশ পঁচিশ বছর আগেও প্রায় প্রতিটি পরিবারেই কম করে হলেও একটি করে গরুর গাড়ি ছিল। অনেক বিত্তবান পরিবারে দুই থেকে চারটি পর্যন্ত গরুর গাড়ি ছিল। সে সময়ে অধিকাংশ নিম্নবিত্ত ও মধ্যবিত্ত পরিবারের আয়ের উৎস ছিল গরুর গাড়ি। এই গাড়ির ওপর নির্ভর করে চলত ওইসব পরিবারের সংসার। গরুর গাড়ি এখন শুধুই স্মৃতি। যুগের পরিবর্তনে আমাদের প্রিয় এই গরুর গাড়ির প্রচলন আজ হারিয়ে যাচ্ছে।

আকরাম উদ্দিন আহমেদ।।
লেখক ।
কুড়িগ্রাম।
১৬/১০/২০২১

মন্তব্যসমূহ

এই ব্লগটি থেকে জনপ্রিয় পোস্টগুলি

কবি-রবি ডাকুয়ার বিজয় দিবসের কবিতা ‘বিজয়ের জন্যে’।।

কেন আমাদের এমন মাথা নিচু ছবি দেখতে হবে ? মুসা কামাল-সম্পাদক- হ্যালো জনতা .কম ।।

তাল বা খেজুর রসের বিকল্প, গোলফল দিয়ে হতে পারে রস গুড়-রবি ডাকুয়া ।।