'প্রয়োজনীয়-অপ্রয়োজনীয়’ ২৭ ' – ছেলে বেলার দিন গুলো এখন কত দূরে!! # আকরাম উদ্দিন আহমেদ।।
## A hellojanata.comPresentation.
প্রয়োজনীয়-অপ্রয়োজনীয়’ ২৭ -
ছেলে বেলার দিন গুলো এখন কত দূরে!!
# আকরাম উদ্দিন আহমেদ।
" ছেলে বেলার দিন গুলো এখন কত দূরে!!"
"ছেলে বেলার দিন গুলো এখন কত দূরে
আজ আসেনা রাজার কুমার পঙ্খীরাজে চড়ে।"
ছেলে বেলায় হেমন্তের এই গান কেন যেন ভীষণ ভালো লাগতো জানতাম না, তখন হয়তো এমনি এমনি শুনতাম। এমনি এমনি গান শুনেই কিনা আজ বুঝতে পারছি এই গানটা আসলে নস্টালজিক অনেক কিছু।
www. hellojanata.com
ছেলে বেলা প্রত্যেকের জীবনের একটি মধুর সময়। ছেলে বেলার দিনগুলি ছিল দুরন্তপনা, দুষ্টুমি আর সারাদিন ছোটাছুটি করে দৌড়ে বেড়ানোর এক অন্যতম মুহূর্ত। আমার ছেলে বেলা যেন আজও আমাকে ডাকে।
সত্যিই আজও বার বার ফিরে যেতে মন চায় ফেলে আসা সেই ছেলে বেলার দিনগুলিতে। মনে পড়ে অবাধে ঘোরা ফেরা আর খেলে বেড়ানো সেই সব দিনগুলির কথা। আপনিও হয়তবা ছেলে বেলা শব্দ দুটি পড়েই স্মৃতির পাতায় হাতড়াতে শুরু করেছেন ফেলে আসা সেই সোনালী দিনগুলোকে।
কার না মনে পড়ে সেই ছেলে বেলার কথা। দিনগুলি এখন শুধুই স্মৃতি হয়ে আছে। ছেলে বেলার সেই বন্ধুদের সাথে জড়িয়ে থাকা স্মৃতি। আজো কাঁদায় ফেলে আসা দিনগুলো। আধুনিক শহরের ইট পাথরের তৈরি বড় বড় অট্টালিকার কারণে মানুষ হাঁপিয়ে উঠেছে। তাই এখনো একটু সুযোগ পেলেই যাদের সুযোগ আছে আমরা চলে যাই সেই গ্রামের বাড়ি। এ যে এক নষ্টালজিক।
www. hellojanata.com
এখন শীত পরে গেছে। হেমন্ত আসতে না আসতেই বাংলার ঘরে ঘরে শুরু হয় নবান্ন। চলে পিঠা বানানোর প্রস্তুতি। ইতোমধ্যে গ্রামেগঞ্জে তৈরিও হচ্ছে নানা ধরনের স্বাদের পিঠা। শুধুই যে গ্রামে তা নয়, শহরের আনাচে কানাচে গড়ে ওঠে বিভিন্ন পিঠার দোকান। এই দোকানেও পিঠা তৈরির ধুম পড়ে যায় গ্রামের মানুষদের মতো। তবে গ্রামীণ জনপদের মানুষ যেভাবে পিঠা তৈরি করে শহরের মানুষ ততটা ভালো পারে না। গ্রামই তো পিঠা তৈরী করার শিকড়। শীতকালের আমেজে খেজুর গুড় আর রস ছাড়া তো পিঠা তৈরির পূর্ণতা কখনই পায়না। খেজুরের গুড় এবং রস দিয়ে ভাপা, পুলি, দুধ চিতই পায়েস যাই হোক না কেন শীতঋতু আর খেজুর গাছ ছাড়া অসম্ভব। শীতঋতুতে গ্রামে গঞ্জে খেজুর রস আর শীতের হরেক রকম পিঠা নিয়েই তো হয় উৎসবের আমেজ। আমরা চলে যেতাম আমাদের নানা বাড়ি রংপুরে। ভোরবেলা নানী পিঠার সরঞ্জাম নিয়ে বসে যেতেন উঠোনে। আমরা গোল হয়ে তার পাশে গিয়ে বসতাম। শুরু হোত পিঠা বানানো আর খাওয়ার ধূম। শীতে নানীর হাতের তৈরী পিঠা না খেলে মনে হোত শীতের আমেজটাই বুঝি অপূর্ণ থেকে যাবে।
খেলাধুলায় আমরা কম যেতাম না। সময় পেলেই বাড়ির উঠানে আমরা খেলতাম। আমাদের বাড়িতে একটি বড় উঠান ছিল। সে উঠানের দুই প্রান্তে দুটি বড় আম গাছ ছিল। আমরা ঐ আম গাছ দুটিকে বুড়ি বানিয়ে বৌছি খেলতাম। আমাদের বাড়ির পাশের বাড়ি থেকে টুকু নামে গায়ে গতরে দশাসই একটা মেয়ে খেলতে আসতো। ও যখন ছি.... বুড়ির দম দিত, আমারা তখন তার হাত থেকে রেহাই পেতে দিতাম ছুট। আমরা ছোট হওয়ায় দৌড়ে ওর হাত থেকে রেহাই পেতাম না। আমাদের পিঠে দড়াম করে দিত একটা কিল। তখন আমাদের প্রাণ হোত ওষ্টাগত। ওর ভাবটা এমন ছিল যে বড়দের সাথে খেলতে এসেছ এখন বুঝ মজা। তার পরেও আমরা তাদের সাথেই খেলতাম। আমরা দাড়িয়া বাধা, গোল্লাছুট, কাণামাছি ও ডাংগুলি খেলতাম। বাড়িতে বাবা মার শাসন ছিল তারপরও আমাদের দুষ্টুমি হই হল্লার কমতি ছিলনা। বৃষ্টির দিনে আম গাছ থেকে আম পরলেই দৌড় দিয়ে এ ওকে ধাক্কা দিয়ে পানিতে ফেলে কে কার আগে আমটি হাতে নেবে তার প্রতিযোগিতা শুরু হয়ে যেত। দুষ্টুমির জন্য বাবার হাতে অনেক মার খেয়েছি তা এখনো ভূলতে পারিনি। তারপরও সেই দিন গুলি ছিল অনেক মধুর।
আমার মনে আছে সে সময় বিনোদনের মাধ্যম হিসাবে আমাদের মহকুমা শহরে কেবল মাত্র রেডিওর প্রচলন ছিল। তাও আবার সবার বাড়িতে ছিলনা, কেবল মাত্র বনেদি পরিবারে ছিল।
তবে আমদের কাছে একটা নতুন খুশির সংবাদ এলো তা হচ্ছে তৎকালীন আমাদের মহকুমা শহরে প্রথম সিনেমা হল প্রতিষ্ঠিত হতে যাচ্ছে। তাও আবার আমার এক দুুলাভাই, মোয়াজ্জেম ভাই সাহেব (জ্যাঠাতো বোনের স্বামী) প্রতিষ্ঠাতা। আর আমাদের পায় কে, মনটা আনন্দে উৎফুল্ল হয়ে উঠলো। বাড়ির কাছেই ধরলা নদীর তীরে কুড়িগ্রামের প্রথম সিনেমা হল। নাম তার 'মিতালি'। আমাদের তো আর তর সইছেনা প্রতিরাতে প্রায় দশটার দিকে প্রজেক্টর মেশিনে ট্রায়েল দেয়া হয়। সেই ট্রায়েল দেখতে যেতে হবে। তবে সন্ধার পরে বাইরে থাকা আমাদের জন্য নিষিদ্ধ ছিল। বাবার কড়া নির্দেশ, "সন্ধার পরে যে ছেলে বাইরে থাকে ধরে নিতে হবে সে ছেলে বখে গেছে।" আমার বড় ভাইয়ের আলাদা ঘরে শোয়ার ব্যবস্থা ছিল। তবে বড় ভাই ভিতু প্রকৃতির হওয়ায় একা থাকতে ভয় পেতেন। তাই আমরা ছোট দুই ভাই পালা করে তার সঙ্গে রাত্রি যাপন করতম। সেদিন আমার থাকার পালা। রাত্রে খাওয়া দাওয়ার পরে ভাইয়ের ঘরে শুতে গেছি। ভাই ফিসফিস করে বল্লেন সিনেমা দেখতে যাবি। আমি তো একপায়ে রাজি। তবে একটু দেড়ি করতে হবে। বাবা মা ঘুমিয়ে পরলে চুপিসারে যেতে হবে। কেননা বাবা টের পেয়ে গেলে আর আস্ত রাখবেনা। যথারীতি আব্বা মা ঘুমিয়ে পরেছেন। আমরা দুই ভাই পা টিপে টিপে আস্তে করে দরজার হুরকো বাইরে থেকে আটকিয়ে রওনা দিলাম। আমি রোমঞ্চ অনুভব করছি। সিনেমা হলের প্রজেক্টর অপারেটর ট্যাপরা মামা আমাদের কেবিনে বসিয়ে দিয়ে গেলেন। কি যেন ত্রুটির কারনে সেদিন আর প্রজেক্টর চালান গেলনা। আমরা নিরাস হয়ে বাসায় ফিরলাম। পরের রাতে আবার মেজো ভাইয়ের পালা। যথারীতি মেজো ভাইকে নিয়ে বড় ভাই আবার চলে গেলেন সিনেমা হলে। এদিকে আব্বা প্রকৃতির ডাকে সাড়া দিতে ঘরের বাইরে এলেন। বড় ভাইয়ের ঘরে কোন সাড়াশব্দ নেই। তিনি ভাবলেন এতো তাড়াতাড়ি তারা ঘুমিয়ে পড়লো নাকি। উনি বড় ভাইয়ের নাম ধরে ডাকলেন কোন সাড়া নেই। দরজায় ঠেলা দিলেন, দরজা খুলে গেল। ভেতরে গিয়ে দেখেন দু'ভাইয়ের কেউ নেই। ওনার মাথায় রক্ত চড়ে গেল। কাল বিলম্ব না করে ঘরে রাখা বেত নিয়ে ছুটলেন সিনেমা হলের দিকে। তারপর দু'ভাইকে বেত্রাঘাত করতে করতে বাসায় নিয়ে আসলেন। সে যাত্রায় আমি বেঁচে গেলাম।
সেবার কিন্তু মারের হাত থেকে বেঁচে গেলাম, এবার কিন্তু মারের হাত থেকে আর বাঁচতে পারলাম না। আমাদের বাড়ির উল্টো দিকে রাস্তার ওপারে মাড়োয়ারির পরিত্যক্ত এক দিঘী ছিল। দিঘীটি ছিল জঙ্গলে পরিপূর্ণ। দিনের বেলা আলো দেখা যেত না। কেউ একা যেতে সাহস পেতোনা। অনেক ভূত প্রেতের ভয় ছিল। এজন্যই মনে হয় যায়গাটি পাখীদের অভয় অরণ্য ছিল। আমাদের কাজ ছিল প্রতিদিন একবার ঐ জঙ্গলে ঢু মারা। উদ্দেশ্য নোতুন পাখী দেখা এবং পাখীর বাসা অনুসন্ধান করা। বাসায় ডিম কিংবা বাচ্চা আছে কিনা। সেদিন বন্ধু আইয়ুবকে সঙ্গে নিয়ে মাড়োয়ারির দিঘির পাড় দিয়ে পাখিদের আস্তানা খুঁজে ফিরে দেখলাম। কিছু না পেয়ে পাশেই মাড়োয়ারির পাটের গুদামে বিরাট আতা গাছটি নজরে পরতেই মনটা আনন্দে নেচে উঠলো। বড় বড় আতা পেকে হোলুদ এবং লাল টুকটুকে হয়ে রয়েছে। কিছু আতা পাখীরা খাচ্ছে। আমাদেরও গাছপাকা আতা খাওয়ার খুব সখ হোল। দাড়োয়ানের পাহাড়া আছে তবে দিনের বেলা গুদামের সামনের দিকে। আমাদের টিনের পাঁচিল টপকাতে হবে। আমরা পাঁচিল টপকালাম। আমি তরতর করে গাছে উঠে গেলাম। আইয়ুব গাছের নীচে। কিছুক্ষণ পরে গাছের নীচ থেকে মানুষের কথার আওয়াজ পেলাম। নীচে তাকিয়ে দেখি আইয়ুব নেই দাড়োয়ান দাড়িয়ে আছে। আমাকে হাতের ইশারায় নামতে বলছে। আমি নিরুপায় হয়ে নীচে নেমে এলাম। দাড়োয়ান খপ করে আমার হাতটা ধরে ফেললো। তারপর সে আমাকে হিরহির করে গুদামের সামনে মালিকের গদিঘরে নিয়ে গেল। মালিক আমাকে আমার বাবার নাম জিগ্গেস করলেন। আমি নাম বললাম। উনি আমাকে কিছু না বলে ছেড়ে দিলেন। ওখান থেকে ছাড়া পেয়ে আমি বাড়ির রাস্তা ধরেছি। এদিকে আমার গুদামে ধরা পরার খবর বাসায় আর অজানা থাকল না। হঠাৎ সামনে দেখি আব্বা একটি বেত হাতে রাস্তা দিয়ে এগিয়ে আসছে। তারপর শুরু হোল বেত্রাঘাত। বাড়ি পযর্ন্ত তিনি আমকে মারতে মারতে নিয়ে এলেন। বাসায় ঢুকেই তিনি উঠানে বেত দিয়ে আট দশ ফুট লম্বা একটি দাগ টেনে দিলেন। আমাকে বল্লেন নাকে খত দিতে হবে। দাগের এ প্রান্ত থেকে ও প্রান্ত পযর্ন্ত নাক টেনে নিয়ে যেতে হবে। মাথা তুললেই বেত।
আর অঙ্গীকার করতে হবে, যেন আর ঐ পথে না যাই। এটাই ছিল আব্বার শাসন।
তবে শাসনের মাঝেও যে সোহাগের কমতি ছিলনা তা আমরা বুঝতে পারি। ২য় শ্রেণি থেকে ৩য় শ্রেণিতে উঠার সময় আমি ক্লাশের ফাষ্ট বয় থেকে হয়ে গেলাম থার্ড বয়। যে প্রথম হয়েছে সে আমার থেকে আট নম্বর বেশী পেয়েছে আর যে ২য় হয়েছে সে দুই নম্বর বেশী পেয়েছে। তৃতীয় শ্রেণির বার্ষিক পরীক্ষার সময় মা আমাকে উৎসাহ দেয়ার জন্য ঘোষনা দিলেন। বল্লেন এবার যদি আমি প্রথম হতে পারি তবে আমাকে সুন্দর একটা গিফট দেবেন। আমি আবারও প্রথম হলাম। তখন সুতি কাপড় ছাড়া অন্য কোন কাপড় বাজারে পাওয়া যেতো না। থান কাপড় কিনে দর্জীর কাছ থেকে কাপড় বানাতে হোত। তবে বাজারে ক্যারোলীন অর্থাৎ সিনথেটিক কাপড়ের তৈরী পোষাক কেবল নেমেছে। এ কাপড়ের দাম অত্যাধিক। সাধারনের নাগালের বাইরে। একটি সার্টের দামে ভালো মানের পাঁচটি সুতির সার্ট বানানো যেতো। মা আমাকে ক্যারোলীন কাপড়ের একটি হাফ হাতা রেডিমেড সার্ট গিফট দিলেন। আমি তো আনন্দে আটখানা। আমার সবচেয়ে প্রিয় ছিল ঐ সার্ট টি।
এ ছাড়াও আমরা বছরে দুটি বড় ছুটির আশায় থাকতাম। কখন গ্রীষ্মকালীন ছুটির সময় আসবে। অনেকদিন স্কুলের বারান্দায় পা রাখতে হবে না। এ ছাড়াও ছিল রোজা এবং ঈদের ছুটি। তখন শুধু খেলাধুলা নিয়ে বেশি ব্যস্ত সময় পার করতাম। ইসকুলের হোম টাক্স আমরা ঠিক মত করে রাখতাম তবে সাধারণ মানের ছাত্ররা পড়াশোনা শিকায় তুলে রাখতো। ছুটির পর যেদিন স্কুল খোলা হতো পূর্বের পড়া কিছুই মনে থাকতো না তাদের। কি পড়া বাড়িতে দেয়া ছিল। পড়া না পারার জন্য তাদের ভাগ্যে জুটতো শিক্ষকের বেত্রাঘাত আর কানমলা।
কত সুন্দরই না ছিল ঐ দিন গুলি। আমরা হারিয়ে ফেলেছি আর ফিরে পাবনা। ভাবতে গেলেই মনটা ব্যাথাতুর হয়ে ওঠে। আর মনে মনে গুনগুন করে গাইতে থাকি-
বাঁশী বুঝি সেই সুরে
আর ডাকবে না,
ফাগুনের সেই দিনগুলি কি
আর থাকবে না।
০৮/০১/২০২২
ছেলে বেলার দিন গুলো এখন কত দূরে!!
# আকরাম উদ্দিন আহমেদ।
" ছেলে বেলার দিন গুলো এখন কত দূরে!!"
"ছেলে বেলার দিন গুলো এখন কত দূরে
আজ আসেনা রাজার কুমার পঙ্খীরাজে চড়ে।"
ছেলে বেলায় হেমন্তের এই গান কেন যেন ভীষণ ভালো লাগতো জানতাম না, তখন হয়তো এমনি এমনি শুনতাম। এমনি এমনি গান শুনেই কিনা আজ বুঝতে পারছি এই গানটা আসলে নস্টালজিক অনেক কিছু।
www. hellojanata.com
ছেলে বেলা প্রত্যেকের জীবনের একটি মধুর সময়। ছেলে বেলার দিনগুলি ছিল দুরন্তপনা, দুষ্টুমি আর সারাদিন ছোটাছুটি করে দৌড়ে বেড়ানোর এক অন্যতম মুহূর্ত। আমার ছেলে বেলা যেন আজও আমাকে ডাকে।
সত্যিই আজও বার বার ফিরে যেতে মন চায় ফেলে আসা সেই ছেলে বেলার দিনগুলিতে। মনে পড়ে অবাধে ঘোরা ফেরা আর খেলে বেড়ানো সেই সব দিনগুলির কথা। আপনিও হয়তবা ছেলে বেলা শব্দ দুটি পড়েই স্মৃতির পাতায় হাতড়াতে শুরু করেছেন ফেলে আসা সেই সোনালী দিনগুলোকে।
কার না মনে পড়ে সেই ছেলে বেলার কথা। দিনগুলি এখন শুধুই স্মৃতি হয়ে আছে। ছেলে বেলার সেই বন্ধুদের সাথে জড়িয়ে থাকা স্মৃতি। আজো কাঁদায় ফেলে আসা দিনগুলো। আধুনিক শহরের ইট পাথরের তৈরি বড় বড় অট্টালিকার কারণে মানুষ হাঁপিয়ে উঠেছে। তাই এখনো একটু সুযোগ পেলেই যাদের সুযোগ আছে আমরা চলে যাই সেই গ্রামের বাড়ি। এ যে এক নষ্টালজিক।
www. hellojanata.com
এখন শীত পরে গেছে। হেমন্ত আসতে না আসতেই বাংলার ঘরে ঘরে শুরু হয় নবান্ন। চলে পিঠা বানানোর প্রস্তুতি। ইতোমধ্যে গ্রামেগঞ্জে তৈরিও হচ্ছে নানা ধরনের স্বাদের পিঠা। শুধুই যে গ্রামে তা নয়, শহরের আনাচে কানাচে গড়ে ওঠে বিভিন্ন পিঠার দোকান। এই দোকানেও পিঠা তৈরির ধুম পড়ে যায় গ্রামের মানুষদের মতো। তবে গ্রামীণ জনপদের মানুষ যেভাবে পিঠা তৈরি করে শহরের মানুষ ততটা ভালো পারে না। গ্রামই তো পিঠা তৈরী করার শিকড়। শীতকালের আমেজে খেজুর গুড় আর রস ছাড়া তো পিঠা তৈরির পূর্ণতা কখনই পায়না। খেজুরের গুড় এবং রস দিয়ে ভাপা, পুলি, দুধ চিতই পায়েস যাই হোক না কেন শীতঋতু আর খেজুর গাছ ছাড়া অসম্ভব। শীতঋতুতে গ্রামে গঞ্জে খেজুর রস আর শীতের হরেক রকম পিঠা নিয়েই তো হয় উৎসবের আমেজ। আমরা চলে যেতাম আমাদের নানা বাড়ি রংপুরে। ভোরবেলা নানী পিঠার সরঞ্জাম নিয়ে বসে যেতেন উঠোনে। আমরা গোল হয়ে তার পাশে গিয়ে বসতাম। শুরু হোত পিঠা বানানো আর খাওয়ার ধূম। শীতে নানীর হাতের তৈরী পিঠা না খেলে মনে হোত শীতের আমেজটাই বুঝি অপূর্ণ থেকে যাবে।
খেলাধুলায় আমরা কম যেতাম না। সময় পেলেই বাড়ির উঠানে আমরা খেলতাম। আমাদের বাড়িতে একটি বড় উঠান ছিল। সে উঠানের দুই প্রান্তে দুটি বড় আম গাছ ছিল। আমরা ঐ আম গাছ দুটিকে বুড়ি বানিয়ে বৌছি খেলতাম। আমাদের বাড়ির পাশের বাড়ি থেকে টুকু নামে গায়ে গতরে দশাসই একটা মেয়ে খেলতে আসতো। ও যখন ছি.... বুড়ির দম দিত, আমারা তখন তার হাত থেকে রেহাই পেতে দিতাম ছুট। আমরা ছোট হওয়ায় দৌড়ে ওর হাত থেকে রেহাই পেতাম না। আমাদের পিঠে দড়াম করে দিত একটা কিল। তখন আমাদের প্রাণ হোত ওষ্টাগত। ওর ভাবটা এমন ছিল যে বড়দের সাথে খেলতে এসেছ এখন বুঝ মজা। তার পরেও আমরা তাদের সাথেই খেলতাম। আমরা দাড়িয়া বাধা, গোল্লাছুট, কাণামাছি ও ডাংগুলি খেলতাম। বাড়িতে বাবা মার শাসন ছিল তারপরও আমাদের দুষ্টুমি হই হল্লার কমতি ছিলনা। বৃষ্টির দিনে আম গাছ থেকে আম পরলেই দৌড় দিয়ে এ ওকে ধাক্কা দিয়ে পানিতে ফেলে কে কার আগে আমটি হাতে নেবে তার প্রতিযোগিতা শুরু হয়ে যেত। দুষ্টুমির জন্য বাবার হাতে অনেক মার খেয়েছি তা এখনো ভূলতে পারিনি। তারপরও সেই দিন গুলি ছিল অনেক মধুর।
আমার মনে আছে সে সময় বিনোদনের মাধ্যম হিসাবে আমাদের মহকুমা শহরে কেবল মাত্র রেডিওর প্রচলন ছিল। তাও আবার সবার বাড়িতে ছিলনা, কেবল মাত্র বনেদি পরিবারে ছিল।
তবে আমদের কাছে একটা নতুন খুশির সংবাদ এলো তা হচ্ছে তৎকালীন আমাদের মহকুমা শহরে প্রথম সিনেমা হল প্রতিষ্ঠিত হতে যাচ্ছে। তাও আবার আমার এক দুুলাভাই, মোয়াজ্জেম ভাই সাহেব (জ্যাঠাতো বোনের স্বামী) প্রতিষ্ঠাতা। আর আমাদের পায় কে, মনটা আনন্দে উৎফুল্ল হয়ে উঠলো। বাড়ির কাছেই ধরলা নদীর তীরে কুড়িগ্রামের প্রথম সিনেমা হল। নাম তার 'মিতালি'। আমাদের তো আর তর সইছেনা প্রতিরাতে প্রায় দশটার দিকে প্রজেক্টর মেশিনে ট্রায়েল দেয়া হয়। সেই ট্রায়েল দেখতে যেতে হবে। তবে সন্ধার পরে বাইরে থাকা আমাদের জন্য নিষিদ্ধ ছিল। বাবার কড়া নির্দেশ, "সন্ধার পরে যে ছেলে বাইরে থাকে ধরে নিতে হবে সে ছেলে বখে গেছে।" আমার বড় ভাইয়ের আলাদা ঘরে শোয়ার ব্যবস্থা ছিল। তবে বড় ভাই ভিতু প্রকৃতির হওয়ায় একা থাকতে ভয় পেতেন। তাই আমরা ছোট দুই ভাই পালা করে তার সঙ্গে রাত্রি যাপন করতম। সেদিন আমার থাকার পালা। রাত্রে খাওয়া দাওয়ার পরে ভাইয়ের ঘরে শুতে গেছি। ভাই ফিসফিস করে বল্লেন সিনেমা দেখতে যাবি। আমি তো একপায়ে রাজি। তবে একটু দেড়ি করতে হবে। বাবা মা ঘুমিয়ে পরলে চুপিসারে যেতে হবে। কেননা বাবা টের পেয়ে গেলে আর আস্ত রাখবেনা। যথারীতি আব্বা মা ঘুমিয়ে পরেছেন। আমরা দুই ভাই পা টিপে টিপে আস্তে করে দরজার হুরকো বাইরে থেকে আটকিয়ে রওনা দিলাম। আমি রোমঞ্চ অনুভব করছি। সিনেমা হলের প্রজেক্টর অপারেটর ট্যাপরা মামা আমাদের কেবিনে বসিয়ে দিয়ে গেলেন। কি যেন ত্রুটির কারনে সেদিন আর প্রজেক্টর চালান গেলনা। আমরা নিরাস হয়ে বাসায় ফিরলাম। পরের রাতে আবার মেজো ভাইয়ের পালা। যথারীতি মেজো ভাইকে নিয়ে বড় ভাই আবার চলে গেলেন সিনেমা হলে। এদিকে আব্বা প্রকৃতির ডাকে সাড়া দিতে ঘরের বাইরে এলেন। বড় ভাইয়ের ঘরে কোন সাড়াশব্দ নেই। তিনি ভাবলেন এতো তাড়াতাড়ি তারা ঘুমিয়ে পড়লো নাকি। উনি বড় ভাইয়ের নাম ধরে ডাকলেন কোন সাড়া নেই। দরজায় ঠেলা দিলেন, দরজা খুলে গেল। ভেতরে গিয়ে দেখেন দু'ভাইয়ের কেউ নেই। ওনার মাথায় রক্ত চড়ে গেল। কাল বিলম্ব না করে ঘরে রাখা বেত নিয়ে ছুটলেন সিনেমা হলের দিকে। তারপর দু'ভাইকে বেত্রাঘাত করতে করতে বাসায় নিয়ে আসলেন। সে যাত্রায় আমি বেঁচে গেলাম।
সেবার কিন্তু মারের হাত থেকে বেঁচে গেলাম, এবার কিন্তু মারের হাত থেকে আর বাঁচতে পারলাম না। আমাদের বাড়ির উল্টো দিকে রাস্তার ওপারে মাড়োয়ারির পরিত্যক্ত এক দিঘী ছিল। দিঘীটি ছিল জঙ্গলে পরিপূর্ণ। দিনের বেলা আলো দেখা যেত না। কেউ একা যেতে সাহস পেতোনা। অনেক ভূত প্রেতের ভয় ছিল। এজন্যই মনে হয় যায়গাটি পাখীদের অভয় অরণ্য ছিল। আমাদের কাজ ছিল প্রতিদিন একবার ঐ জঙ্গলে ঢু মারা। উদ্দেশ্য নোতুন পাখী দেখা এবং পাখীর বাসা অনুসন্ধান করা। বাসায় ডিম কিংবা বাচ্চা আছে কিনা। সেদিন বন্ধু আইয়ুবকে সঙ্গে নিয়ে মাড়োয়ারির দিঘির পাড় দিয়ে পাখিদের আস্তানা খুঁজে ফিরে দেখলাম। কিছু না পেয়ে পাশেই মাড়োয়ারির পাটের গুদামে বিরাট আতা গাছটি নজরে পরতেই মনটা আনন্দে নেচে উঠলো। বড় বড় আতা পেকে হোলুদ এবং লাল টুকটুকে হয়ে রয়েছে। কিছু আতা পাখীরা খাচ্ছে। আমাদেরও গাছপাকা আতা খাওয়ার খুব সখ হোল। দাড়োয়ানের পাহাড়া আছে তবে দিনের বেলা গুদামের সামনের দিকে। আমাদের টিনের পাঁচিল টপকাতে হবে। আমরা পাঁচিল টপকালাম। আমি তরতর করে গাছে উঠে গেলাম। আইয়ুব গাছের নীচে। কিছুক্ষণ পরে গাছের নীচ থেকে মানুষের কথার আওয়াজ পেলাম। নীচে তাকিয়ে দেখি আইয়ুব নেই দাড়োয়ান দাড়িয়ে আছে। আমাকে হাতের ইশারায় নামতে বলছে। আমি নিরুপায় হয়ে নীচে নেমে এলাম। দাড়োয়ান খপ করে আমার হাতটা ধরে ফেললো। তারপর সে আমাকে হিরহির করে গুদামের সামনে মালিকের গদিঘরে নিয়ে গেল। মালিক আমাকে আমার বাবার নাম জিগ্গেস করলেন। আমি নাম বললাম। উনি আমাকে কিছু না বলে ছেড়ে দিলেন। ওখান থেকে ছাড়া পেয়ে আমি বাড়ির রাস্তা ধরেছি। এদিকে আমার গুদামে ধরা পরার খবর বাসায় আর অজানা থাকল না। হঠাৎ সামনে দেখি আব্বা একটি বেত হাতে রাস্তা দিয়ে এগিয়ে আসছে। তারপর শুরু হোল বেত্রাঘাত। বাড়ি পযর্ন্ত তিনি আমকে মারতে মারতে নিয়ে এলেন। বাসায় ঢুকেই তিনি উঠানে বেত দিয়ে আট দশ ফুট লম্বা একটি দাগ টেনে দিলেন। আমাকে বল্লেন নাকে খত দিতে হবে। দাগের এ প্রান্ত থেকে ও প্রান্ত পযর্ন্ত নাক টেনে নিয়ে যেতে হবে। মাথা তুললেই বেত।
আর অঙ্গীকার করতে হবে, যেন আর ঐ পথে না যাই। এটাই ছিল আব্বার শাসন।
তবে শাসনের মাঝেও যে সোহাগের কমতি ছিলনা তা আমরা বুঝতে পারি। ২য় শ্রেণি থেকে ৩য় শ্রেণিতে উঠার সময় আমি ক্লাশের ফাষ্ট বয় থেকে হয়ে গেলাম থার্ড বয়। যে প্রথম হয়েছে সে আমার থেকে আট নম্বর বেশী পেয়েছে আর যে ২য় হয়েছে সে দুই নম্বর বেশী পেয়েছে। তৃতীয় শ্রেণির বার্ষিক পরীক্ষার সময় মা আমাকে উৎসাহ দেয়ার জন্য ঘোষনা দিলেন। বল্লেন এবার যদি আমি প্রথম হতে পারি তবে আমাকে সুন্দর একটা গিফট দেবেন। আমি আবারও প্রথম হলাম। তখন সুতি কাপড় ছাড়া অন্য কোন কাপড় বাজারে পাওয়া যেতো না। থান কাপড় কিনে দর্জীর কাছ থেকে কাপড় বানাতে হোত। তবে বাজারে ক্যারোলীন অর্থাৎ সিনথেটিক কাপড়ের তৈরী পোষাক কেবল নেমেছে। এ কাপড়ের দাম অত্যাধিক। সাধারনের নাগালের বাইরে। একটি সার্টের দামে ভালো মানের পাঁচটি সুতির সার্ট বানানো যেতো। মা আমাকে ক্যারোলীন কাপড়ের একটি হাফ হাতা রেডিমেড সার্ট গিফট দিলেন। আমি তো আনন্দে আটখানা। আমার সবচেয়ে প্রিয় ছিল ঐ সার্ট টি।
এ ছাড়াও আমরা বছরে দুটি বড় ছুটির আশায় থাকতাম। কখন গ্রীষ্মকালীন ছুটির সময় আসবে। অনেকদিন স্কুলের বারান্দায় পা রাখতে হবে না। এ ছাড়াও ছিল রোজা এবং ঈদের ছুটি। তখন শুধু খেলাধুলা নিয়ে বেশি ব্যস্ত সময় পার করতাম। ইসকুলের হোম টাক্স আমরা ঠিক মত করে রাখতাম তবে সাধারণ মানের ছাত্ররা পড়াশোনা শিকায় তুলে রাখতো। ছুটির পর যেদিন স্কুল খোলা হতো পূর্বের পড়া কিছুই মনে থাকতো না তাদের। কি পড়া বাড়িতে দেয়া ছিল। পড়া না পারার জন্য তাদের ভাগ্যে জুটতো শিক্ষকের বেত্রাঘাত আর কানমলা।
কত সুন্দরই না ছিল ঐ দিন গুলি। আমরা হারিয়ে ফেলেছি আর ফিরে পাবনা। ভাবতে গেলেই মনটা ব্যাথাতুর হয়ে ওঠে। আর মনে মনে গুনগুন করে গাইতে থাকি-
বাঁশী বুঝি সেই সুরে
আর ডাকবে না,
ফাগুনের সেই দিনগুলি কি
আর থাকবে না।
০৮/০১/২০২২
আকরাম উদ্দিন আহমেদ।
লেখক।
কুড়িগ্রাম।
লেখক ।।
কুড়িগ্রাম ।।
# জনাব আকরাম উদ্দিন আহমেদ হ্যালো জনতার নিয়মিত লেখক ।।
# তাঁর সকল লেখা আমাদের ব্লগ এবং সামাজিক মাধ্যমে প্রচারিত হয় ।।
হ্যালো জনতা ডট কম।।
www. hellojanata.com –
হ্যালো জনতার ব্লগ সাবস্ক্রাইব করুন।।
hellojanata.com ..
https://hellojanata.com/
https://hellojanata350.blogspot.com/
www. hellojanata.com
উত্তরমুছুন